রবিবার, ২৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:৫৪ পূর্বাহ্ন

আমতলী প্রতিনিধিঃ বরগুনার আমতলীতে অনুমোদনহীন সাত ব্যাংক একাউন্টে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা জমা হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বীর মুিক্তযোদ্ধাদের সম্মানি ভাতা বিতরণ কমিটি কর্তৃক অনুমোদন ছাড়াই সাতটি ব্যাংক একাউন্টে এক বছরে ২২লক্ষ টাকা জমা হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জেল হোসেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যোগসাজশে এসব ভূয়া ব্যাংক হিসাব খুলে টাকা আত্মসাৎ করেছেন ।
এ ঘটনা জানাজানি হলে আমতলী উপজেলা প্রশাসন তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। প্রশাসন বলছে,অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সূত্রে জানা যায়, এই ভাতাপ্রাপ্তরা কেহই মুক্তিযোদ্ধা নন। তাদের ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করে এই সুবিধা আদায় করেছেন তোফাজ্জেল হোসেন।
জানা গেছে, প্রতি মাসে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতার পে রোল প্রস্তুত করে উপজেলা নির্বাহী অফিসার যাচাই করে তা সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পাঠিয়ে দেন। উপজেলা নির্বাহী অফিসার কর্তৃক যাচাই হয়ে যাওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের ভাতা তাদের ব্যাংক হিসাবে জমা হয়। কিন্তু আমতলীতে সাতটি ব্যাংক একাউন্টে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকার জমা হয় “ উপজেলা বীর মুিক্তযোদ্ধা সম্মানি ভাতা বিতরণ কমিটি” কর্তৃক অনুমোদন ছাড়াই। অভিযোগ রয়েছে মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জেল হোসেন এসব ব্যাংক হিসাব খুলেছেন। মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জেল হোসেনের নিজের নামেই ৪টি এবং বাকি তিনটি হিসাব তাঁর স্ত্রী স্কুল শিক্ষিকা শাহানারা কাজল,একটি তার বোন লুৎফা বেগম এবং অন্যটি বরিশালের কলেজ রোড শাখার ইউনুচ মিয়ার নামে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে,মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জেল হোসেনের নামে চারটি ব্যাংক হিসাবে জমা হয়েছে ১১লক্ষ২হাজার টাকা। তোফাজ্জেলের স্ত্রী স্কুল শিক্ষিকা শাহানারা কাজলের ব্যাংক হিসাবে ২০২২সালের ২৯ডিসেম্বর থেকে ২০২৩সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১লক্ষ ৭২হাজার টাকা জমা হয়েছে।তোফাজ্জেলের বোন লৎফা বেগমের ব্যাংক হিসাবে২০২৩সালের ২৬জানুয়ারী থেকে ২০২৪সালের ৩০অক্টোবর পর্যন্ত ৪লক্ষ৪৪হাজার টাকা জমা হয়েছে।বরিশালে কলেজ রোড শাখায় মো.ইউনুচ মিয়ার নামে ৩লক্ষ ৪৩হাজার১০৩টাকা জমা হয়েছে। এসব হিসেবে প্রতিমাসে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা আসে।৭টি হিসেবের মধ্যে ৬টি হিসাবে এসব জালিয়াতি ধরা পরার আগ পর্যন্ত ২২লক্ষ১হাজার১০৪টাকা জমা হয়েছে।
আমতলী সোনালী ব্যাংক পিএলসি সূত্রে জানা গেছে, দৈনন্দিন লেনদেন সংক্রান্ত ভাউচার চেক করতে গিয়ে কিছু হিসাবে অস্বাভাবিক লেনদেন পরিলক্ষিত হয়।ব্যাংক কর্তৃপক্ষ লেনদেন যাচাইয়ের সময় মুক্তিযোদ্ধা ভাতার অর্থ অননুমোদিতভাবে ৭টি হিসাবে জমা হওয়ার বিষয়টি প্রকাশ পায়।পরে দেখা যায় নিয়মিত মুক্তিযোদ্ধা ভাতা উত্তোলনকারী মুক্তিযোদ্ধা মোঃ তোফাজ্জেল হোসেনের আমতলী শাখার সঞ্চয়ী হিসাব (যার মধ্যে একটি হিসাব যথাযথ প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত), ০১টি হিসাব এমডিএস (ডিপিএস), ০২টি মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন এর অননুমোদিত সঞ্চয়ী হিসাব, ০১টি মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন এর স্ত্রী স্কুল শিক্ষিকা শাহানারা কাজল এর সঞ্চয়ী হিসাব তার বোন লুৎফা বেগমের সঞ্চয়ী হিসাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা জমা হয়।অপর হিসাবটি জনৈক মোঃ ইউনুচ মিয়ার নামে সোনালী ব্যাংক, কলেজ রোড শাখা, বরিশালে জমা হয়। জালিয়াতি ধরা পরায় ব্যাংকের ব্যবস্থাপক তাদের উধ্বর্তন কর্মকর্তাদের অবহিত করেন।পরে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের এমডি’স স্পেশাল স্কোয়াড বিষয়টি তদন্ত করে সত্যতা পায়। তদন্তের সময় মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জেল হোসেন তার সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেন। তিনি জানান, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় এই লেনদেনগুলো সম্পন্ন করেছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তোফাজ্জেল হোসেন বরগুনার আমতলী উপজেলার গুলিশাখালী ইউনিয়নের কালিবাড়ি নামক এলাকার মো. আয়নুদ্দিন কাজীর ছেলে। তিনি আমতলীর সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার একেএম সামসুদ্দিন শানুর আত্মীয় হওয়ায় তার মাধ্যমেই জালিয়াতি করে মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় গেজেটভুক্ত হন। পরে তার ৪৭০ নং গেজেট অনুযায়ী তিনি ২০০৯ সাল থেকে মুক্তিযোদ্ধা ভাতাপ্রাপ্ত হন। তবে স্থানীয় অনেক মুক্তিযোদ্ধার দাবি- মুক্তিযুদ্ধের সময় তোফাজ্জেলের বয়স কম থাকায় তিনি দেশের কোথাও কোনো মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেননি। ক্ষমতার অপব্যবহার করেই তিনি মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লিখিয়েছেন।
একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমাদের ভাতা আমরা এত বছর ধরে সঠিকভাবে পেয়ে আসছি।অবাক হলাম কিভাবে মুক্তিযোদ্ধা ভাতার টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে। আমরা এর সুষ্ঠু সমাধান চাই।”আরেকজন মুক্তিযোদ্ধা জানান, “এই ধরনের ঘটনা শুধু আমাদের অর্থনৈতিক সমস্যায় ফেলছে না, বরং আমাদের সম্মানকেও আঘাত করছে।”
আমতলী উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার একেএম সামসুদ্দিন শানু বলেন,মুক্তিযোদ্ধা না তার একাউন্ট হয় কিভাবে। এ বিষয়টি আমার জানা নেই। তোফাজ্জেল নিজের নামে চারটি,স্ত্রী,বোন ও এক আত্মীয় নামে এসব ব্যাংক একাউন্ট খুলে টাকা নিয়েছেন এমন প্রশ্ন করলে তিনি বলেন,তোফাজ্জেলের স্ত্রী একজন প্রাইমারী শিক্ষক তার টিচার একাউন্ট আছে। তার নামে মুক্তিযোদ্ধা ভাতা যাবে কেন? এসব থাকলে আপনি ব্যাংকে যাচাই বাছাই করেন। তোফাজ্জেলের বোন লুৎফা তাতো জানিনা। আপনি সকল তথ্য আমাকে দিলে আমি একটু দেখতে পারতাম।এসব তো হতেই পারেনা।
আমতলী উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি একেএম খায়রুল বাশার বুলবুল বলেন,আমাদের আমতলীর মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জেল হোসেনের বয়স হয়নি তবুও তিনি মুক্তিযোদ্ধা হয়েছেন এমন অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।মুক্তিযোদ্ধা ভাতা তোফাজ্জেল কিভাবে তার নিজের,স্ত্রী,বোন ও এক আত্মীয় নামে অননুমোদিত ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করেছেন তা শুনে আমরা আচার্য্য হলাম।এর সাথে যারা জড়িত তাদেও বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করেন তিনি।
ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিজের নামে চারটি, স্কুল শিক্ষিকা স্ত্রী, বোন এবং এক আত্মীয়ের নামে মোট ৭টি অনুমোদনহীন ব্যাংক একাউন্ট খুলে মুক্তিযোদ্ধার ভাতার ২২লক্ষ টাকা ব্যাংক একাউন্টে নিয়েছেন এমন প্রশ্ন করলে মুক্তিযোদ্ধা তোফাজ্জেল হোসেন কোন উত্তর না দিয়ে বলেন, ভূল হয়েছে বলে ক্ষমা করে দেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আশরাফুল আলম বলেন, আমরা অভিযোগটি গুরুত্ব সহকারে তদন্ত করছি। অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বরগুনা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ শফিউল আলম বলেন, বরগুনার আমতলীতে একজন মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের নামে সাতটি ভাতা তোলার বিষয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন পেলে মন্ত্রণালয়ে জানানো হবে।
© All rights reserved 2022 © aponnewsbd.com
Leave a Reply